Jan 072013
 

আমি কি করিবো রে প্রাননাথ
তুমি বিনে
আমার সোনার অঙ্গ পুড়ে অঙ্গার
হল দিনে-দিনে রে প্রাননাথ
তুমি বিনে

আসা যাওয়া সার হইয়াছে
নিয়তির বিধানে
জন্ম-জ্বরা যম-যাতনা
বাড়ে দিনে দিনে রে
প্রাননাথ তুমি বিনে Continue reading »

Jan 062013
 

তুমি কই যাও রে ভাটিয়াল নাইয়া
ললিত সুরে গাইয়া গান
গান শুনিয়া চমকে আমার প্রাণ, মাঝি
গান শুনিয়া চমকে আমার প্রাণ

বাঁকা তোমার মুখের হাসি
দেখে মন হইল উদাসী রে
ও নাইয়া
তুমি হইতায় যাদি দেশের দেশি
নতুন যৌবন করতাম দান Continue reading »

Jan 062013
 
shah abdul karim loko utshab

celebrating shah abdul karim loko utshab

Shah Abdul Karim is one of the most recognised and celebrated baul icons of his time. He was

born into a financially strained family in one of the

most remote villages, Ujan Dhal, under Derai upazilla of Sunamganj district. The bard, who turned 94 this year, was unable to join his birthday

celebrations owing to several age-related ailments.

During a recent visit to his residence (on the occasion of the two-day “Shah Abdul Karim Loko Utshab ‘09″ arranged by the villagers and sponsored by banglalink), this correspondent found that for much of the time the nonagenarian remains asleep. His only son Shah Nur Jalal spoke on Karim’s life and works as well as his current state. Continue reading »

Jan 062013
 

ভাটির পুরুষ (bhatir purush) বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের উপরে নির্মিত আমার দেখা সেরা তথ্যচিত্র, এখানে পার্ট-১ দেয়া হোল, ক্রমান্বয়ে সবগুলো পার্ট দেয়া হবে, কৃতজ্ঞতাঃ রোজস্টার

 



Jan 052013
 

সরল তুমি নাম যে তোমার সরলা
শান্ত অতি শুদ্ধমতি সবাই বলে মন ভালা
সরল তুমি নাম যে তোমার সরলা

দেখলে শ্রদ্ধা হয় অন্তরে
কতো ছেলে ভক্তিভরে
‘মা’ বলে সম্বোধন করে নিতে চায় পদধুলা
সরল তুমি নাম যে তোমার সরলা
Continue reading »

Jan 052013
 

আগের বাহাদুরি এখন গেলো কই?
চলিতে চরণ চলেনা দিনে দিনে অবশ হই
আগের বাহাদুরি এখন গেলো কই?

মাথায় চুল পাকিতেছে
মুখের দাঁত নড়ে গেছে
চোখের জ্যোতি কমেছে মনে ভাবি চশমা লই
মন চলেনা রং-তামাশায় Continue reading »

Jan 042013
 

সরলা গো, কি করিতে কি করিলাম
লাভের আশায় মূল হারাইয়া
ধনের কাঙ্গাল সাজিলাম
কি করিতে কি করিলাম
সরলা গো, কি করিতে কি করিলাম

ছেলেবেলা ছিলাম ভালো
মনেতে আনন্দ ছিল
যৌবন আলো তারপরে পাইলাম । Continue reading »

Jan 032013
 

এই দুনিয়া মায়াজালে বান্ধা
শুনবে কি বুঝবেও কি ওরে ও মন ধুন্ধা
এই দুনিয়া মায়াজালে বান্ধা

কতজনা পাগল হইয়া
মায়াতে মন মজাইয়া
আপনার ধন পরকে দিয়া সার হইয়াছে কান্দা
বহুরূপী রঙ-বাজারে মন থাকেনা মনের ঘরে
রঙ দেখাইয়া প্রাণে মারে লাগাইয়া ধান্ধা Continue reading »

Jan 022013
 
Baul Somrat Shah Abdul Karim

Baul Somrat Shah Abdul Karim

শেখ ইমতিয়াজ মেহেদী হাসান : ‘সখি,কুঞ্জ সাজাও গো’-কিন্তু কার জন্য এ কুঞ্জ সাজাবো? আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমির সমস্যার প্রেক্ষাপট নিজের সুর দ্বারা বদলানোর সেই মহান আদর্শে আদর্শিত পথিকৃৎ তথা প্রবাদ পুরুষ বাংলাদেশের বাউল শিল্পের স্বপ্নদ্রষ্টা, বিখ্যাত বাউল সম্রাট শাহ্‌ আব্দুল করিম অসংখ্য অপূর্ণতা আর অতৃপ্ত হৃদয় নিয়ে আমাদের মাঝ থেকে চিরবিদায় নিয়ে ঢংকা বাজিয়ে গেছেন একটি সৃজনশীল বাংলাদেশ গড়ার। তাই একটি স্বাধীন ও স্বার্বভৌম দেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে এ সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করা ঠিক হবে কি? আসুন দেশের সমস্যা বদলানোর প্রেক্ষাপটে আজ এক কাতারে সামিল হই,বদলে দেই সমস্যার ক্যানভাস।
আইসিইউ-তে লাইফ সাপোর্ট এলিমেন্ট দিয়ে রাখা অবস্থায় সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার উজানধল গ্রামের কৃতি তথা শ্রেষ্ঠ সন্তান,বাংলার সমস্যার প্রেক্ষাপট বদলাতে অক্লান্ত শ্রম আর মেধা দিয়ে জন্ম দেয়া প্রায় দেড় হাজার গানের সৃষ্টিকর্তা, জীবদ্দশায় একুশে পদক, মেরিল-প্রথম আলো সম্মাননা পুরস্কারসহ বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত বাউল শিল্পের প্রবাদ পুরুষ শাহ্‌ আব্দুল করিম বিগত ২০১০ সালের ১২ সেপ্টেম্বর’০৯ সকাল ৭:৫৮ মিনিটে আমাদেরকে অসীম শূন্যতা আর শোকের মহাসাগরে ভাসিয়ে সিলেটের নূরজাহান হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন।
তিনি চলে গেছেন এ কথা অপ্রিয় হলেও সত্য। কিন্তু একথাও ওই ধ্রুব আকাশের মত সত্য যে, তার মৃত্যু মানেই বাংলার সমস্যার প্রেক্ষাপট বদলাতে অসংখ্য সহযোদ্ধার জন্ম নেওয়া। আর এ’সকল সহযোদ্ধা তাদের পথিকৃৎ তথা প্রবাদ পুরুষের আদর্শে দীক্ষিত হয়ে উদাত্ত স্লোগান আর মুক্তির বিজয় মিছিল নিয়ে পদচারনা করবে বাংলার স্নেহ-ধুলিমাখা কর্দমাক্ত রাজপথে। তাই নিঃসন্দেহে তিনি আমাদের হৃদয়ের মধ্যমণি হয়ে আছে,তাই না?সংস্কৃতি অঙ্গনের পবিত্র নেশায় আসক্ত বাউল সম্রাট জীবদ্দশায় তার নিজ গ্রামের নৈশ বিদ্যালয়ে মাত্র ৮ দিন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেন।তারপর যা শিখেছেন নিজের চেষ্টায় আর সেটাই তার সব থেকে বড় অর্জন যা আমাদের সকলেরই দৃশ্যমান।
দারিদ্রের মধ্যেই কঠোর প্ররিশ্রমের মধ্যদিয়ে বেড়ে উঠেন শাহ্‌ আব্দুল করিম। শৈশব থেকেই একতারা ছিল তার নিত্যসঙ্গি। সঙ্গীতের প্রতি তিনি এতটাই অনুরাগী ছিলেন যে তা ছেড়ে চাকরিতে জড়াননি তিনি। ফলে কাটেনি তার দরিদ্র্য এবং বাধ্য হয়ে নিয়জিত ছিলেন কৃষিশ্রমে। জীবন কেটেছে সাদাসিদে ভাবে। তবে কোন কিছুই তার সঙ্গীতপ্রেম ঠেকাতে পারেনি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাউল ও আধ্যাত্নিক গানের তালিম নিতে থাকেন কমর উদ্দিন, সাধক রসিদ উদ্দিন, শাহ্‌ ইব্রাহিম মোস্তান বকস এর কাছ থেকে। দীর্ঘ এ সঙ্গীত জীবনে বাউল ও আধ্যাত্নিক গানের পাশাপাশি ভাটিয়ালি গানের ও বিচরণ ছিল তার। লিখেছেন ও সুর দিয়েছেন ১৬শ’র বেশি গান। যেগুলো ছয়টি বইয়ে গ্রন্থিত আছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য গানের মধ্যে আরও রয়েছে ু’গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু-মুসলমান……. আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম’,’ বন্দে মায়া লাগাইছে, পিরিতি শিখাইছে’, ‘বসন্ত বাতাসে সইগো’, ‘আমি কুলহারা কলঙ্কিনী’ ইত্যাদি। বাংলা একাডেমীর উদ্যোগে তার ১০ টি গান ইংরেজীতে অনূদিত হয়েছে। লালন শাহ্‌, পাঞ্জু শাহ্‌ ও দুদ্দু শাহ্‌ এর দর্শনে অনুপ্রাণিত ছিলেন আব্দুল করিম।
বাংলার বাউল শিল্পের একচ্ছত্র অধিপতি তথা অগ্রদূত শাহ্‌ আব্দুল করিমের ২০০৪ সালে স্মৃতিশক্তি লোপ পায়। ক্রমেই নানা রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে কখনও হাসপাতালে আবার কখনও বাড়ীতে দিন কাটান তিনি। শিল্পীর ইচ্ছানুযায়ী এ বছরের প্রথম দিকে মান্যবর সিলেট বিভাগীয় কমিশনারের উদ্যোগে বাউল সম্রাট শাহ্‌ আব্দুল করিমের সমগ্র সৃষ্টিকর্ম নিয়ে একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়।
২০০০ সালে তিনি কথাসাহিত্যিক আবদুর রউফ পদক পান। এছাড়া দ্বিতীয় সিটিসেল চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে আজীবন সম্মাননায় অধিষ্ঠিত হন শাহ্‌ আবদুল করিম। উল্ল্লেখযোগ্য অন্যান্য পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে : লেবাক অ্যাওয়ার্ড ২০০৩, সিলেট সিটি কর্পোরেশন সম্মাননা ২০০৬, অভিমত সম্মাননা ২০০৬, মেরিল-প্রথম আলো আজীবন সম্মাননা ২০০৪, আইডিয়া সংবর্ধনা স্মারক ২০০২ ও রাগীব-রাবেয়া সাহিত্য পদক ২০০০।
শুধু লেখনীর তুলিতে কি সকল ভক্ত আর শুভানুধ্যায়ীদের হৃদয় গহীনে শোকের মাতম তুলে চিরবিদায় নেয়া সকল শিল্পীর পিতৃতুল্য সেই গুরু,ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাউল সম্রাট,গুনীজন শাহ্‌ আব্দুল করিমের গুণকীর্তন ফুটিয়ে তোলা যায়? মায়ের বুকে সন্তান নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে ঘুমিয়ে নিজে স্বস্তিবোধ করে আর গর্ভধারিনী মা হয় ধন্য,অপরপক্ষে উর্বরা বাংলা এমনই একজনকে চিরজীবনের জন্য আশ্রয় দিয়ে স্বস্তি,শান্তি আর নিজেকে গর্বিতের আসনে অধিষ্ঠিত করেছে সে হল আর কেউ নয়…..আমাদের সকলের অতিপ্রিয় মুখ বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমকে। তাই আসুন আজ বাউল সম্রাট শাহ্‌ আব্দুল করিমের আদর্শকে পুঁজি করে দেশের সমস্যার প্রেক্ষাপট বদলানোর শপথ নিয়ে একসুরে গেয়ে উঠি…..

জন্মভূমি রক্ষা হেতু কে ডরে মরিতে? যে ডরে,ভীরু সে মূঢ়,শত ধিক তারে।

Jan 022013
 

কালনীর তীরে যে রাখাল বালক মাঠের গানে, মাটির টানে নিজেকে সমর্পণ করেন, কালনীর ঢেউ ও বাতাস যাকে একজন সাধক পুরুষে পরিণত করে তিনি বাউলসম্রাট শাহ্ আব্দুল করিম। সহজ ভাষায় সুরের ইন্দ্রজাল সৃষ্টি করে মানুষের হৃদয়ে স্থ্ান করে নেন। তাঁর গানের রাজ্যে তিনি একক অধিপতি। সেই গানের সুরে যুগ যুগ সৌরভ ছড়াবে। লোকসঙ্গিতের যে শাখাতে হাত দিয়েছেন সোনা ফলেছে। তিনি রাধারমন, হাসন রাজার যোগ্য অনুসারী। বাংলা ভাষায় তাঁর মত এত জনপ্রিয় সঙ্গিত রচনার বিরল দৃষ্টান্ত কোন বাউল শিল্পীর পক্ষে সম্ভব হয়নি। রাত জাগা পাখির মত গ্রাম-অঞ্চলে রাতের পর রাত পালাগান গেয়েছেন

Shah Abdul Karim with mustaqim

Shah Abdul Karim with mustaqim(writer)

২০০৭ সালের জুলাই মাসে লন্ডন এসেছিলেন টাওয়ার অব লন্ডন’র পাশে ‘একটি শাহেদ আলী’ অনুষ্ঠানে। কিন্তু অনুষ্ঠানের আগের রাতে অসুস্থ হয়ে দ্যা রয়েল লন্ডন হস্পিটালে ভর্তি হন। পহেলা জুলাই রবিবার সকালে তাঁর লন্ডনে আগমন ও অসুস্থতার খবর শুনে আমি ও কবি শাহ সোহেল সকাল এগারোটার দিকে সেখানে যাই। সাঈম চৌধুরী ও আমিনা আক্তার আলী সহ কয়েকজনকে পাই তাঁর সার্বক্ষনিক দেখাশুনায়। বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার জন্য গলায় একটি মাইনর অপারেশন করে পাইপ লাগানো ছিল। অস্পষ্ট ভাষায় কথা বলছিলেন। একজন শাহ সোহেল কে দেখে বলে আপনার নাতি এসেছে। তিনি তাৎকনাত মাথা তুলার চেষ্টা করে বলেন নাতি বসো! সে নিজ হাতে তাঁকে কিছু খাওয়াতে সামর্থ হয়। তাঁর কষ্ট হওয়ার সম্ভবনার জন্য ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও কিছু জিজ্ঞেস করিনি।
অপলক দৃষ্টিতে এই ভাটী বাংলার অকৃত্রিম বন্ধুকে মুগ্ধ নয়নে দেখি। হসপিটালে ভিজিটরদের সীমাবদ্ধতার জন্য ঘন্টা খানিকের মধ্যে চলে আসি। এই দেখা-ই ছিল শেষ দেখা। তিনি ১২ সেপ্টেম্বর ২০০৯ রোজ শনিবার সকালে পৃথীবির মায়া ছেড়ে তাঁর অন্তরে লালিত মাওলার সান্নিধ্যে চলে যান। তাঁর জীবন গাড়ি চিরদিনের জন্য থেমে যায়। তিনি মানব গাড়ি চড়ে প্রাণনাথের উদ্দেশ্যে চলে যান। স্মৃতির মণিকোটায় তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি বারবার অনুভব করি। সেই স্মৃতির জানালা খুলে পিছন পানে তাকাই! তাঁর ছবি চোখে ভাসে!
দিন তারিখ মনে নেই ১৯৮৫ সাল। ফেব্র“য়ারী মাস হবে। চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ি। আমাদের বাড়িতে রাতে গান হয়েছে। সিলেট থেকে গায়করা এসেছেন। কিন্তু এসব গান শুনার সুযোগ বা দুঃসাহস কোনটাই ছিলনা। সকালে দেখি পূবের ঘরে কয়েকজন লোক। তাদের পাশে ঢোল তবলা সহ গানের বিভিন্ন সরঞ্জাম। যে কোন ভাবে জানতে পেরেছি তাদের মধ্যে একজন বড় গায়ক আছেন। অন্যান্যরা তার শিষ্য। সেই বড় গায়ক ছিলেন বাউল শাহ্ আব্দুল করিম। আমি দরজা-জানালা দিয়ে বারবার লুকিয়ে তাদের দেখেছি। আমার চাচা শাহ্ মখলিছুর রহমান তাদেরকে বাড়িতে এনেছিলেন। ছোটবেলার সেই দিনের স্মৃতি এখনো ছায়ার মত চোখে লেগে আছে। করিম সাহেব গোসল করেছেন। গায়ে মাখার তেলের জন্য বলেছেন। চাচী বলেছেন কি তেল দেব! তিনি বলেন সরিষার তেল দাও মা! তিনি উদোম গায়ে তেল দেন। আরো কয়েকজন পাশে বসা ছিলেন। আমাদের পূর্ববর্তী গ্রামের এক তরুণও বসে তাদের সাথে হুক্কা টানছিল। তিনি দেখে বলেন, এত অল্প বয়সে এসব করা ঠিক নয়। ভবিষ্যতে ক্ষতি হবে। ঐ দিনের স্মৃতি এর চেয়ে আর বেশি মনে নেই।
যতদিন যায় করিম সাহেবের সাথে আমাদের বাড়ির সম্পর্ক বাড়তে থাকে। আমার চাচা শাহ আমিন উল্লা’র (কবি শাহ সোহেল’র পিতা) সাথে ঘণিষ্ঠতা আরো দৃঢ় হয়। সকাল সন্ধ্যা তিনি আমাদের বাড়িতে আসা যাওয়া করতেন। অনেক সময় সন্ধ্যা বেলা দেখতাম তিনি গ্রে কালারের ছোট ছোট টাইপ করা একটি কোর্ট গায়ে পড়ে আসতেন। সামনে পড়লে সালাম করতাম নতুবা চেয়ে দেখতাম। কিন্তু কথা বলা বা গান শুনার কোন আগ্রহ ছিল না। বাড়ির সবার মুখে তাঁর গানের জয়গান শুনতাম। আমার আব্বা চাচারা সবাই ভক্ত। বিশেষত শাহ মখলিছুর রহমান মাঝে মাঝে তাঁর গানের বিভিন্ন প্রসঙ্গ তুলতেন। তিনি একদিন আমাকে স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, কবি নজরুলের পর বাংলা ভাষায় প্রতিভাবান ব্যক্তি শাহ্ আব্দুল করিম। তাঁরা প্রভূর বিশেষ ভাবে গড়া। তিনি কবি কাজী নজরুল ইসলামকেও দেখেছেন। আমার কাছে সেদিনের কথা ততটা গুরুত্ব মনে হয় নি। কিন্তু কালপরিক্রমায় তার কথা যে খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি তা কাউকে আর বুঝাতে হবেনা। চাচাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনি কতদিন থেকে তাঁকে চেনেন? তিনি বলেন, আমাদের বাড়িতে আসার কয়েক বছর পূর্ব থেকে। কিন্তু এরও অনেক আগে থেকে তাঁর গান শুনেছি।
১৯৯২ সালের এপ্রিল মাস। একদিন চাচা বলেন, আগামী সপ্তাহে টিভি’তে ‘ভরা নদীর বাঁকে’ অনুষ্ঠানে শাহ্ আব্দুল করিম গান গাইবেন। আমরা অনুষ্ঠানের প্রতীক্ষায় থাকি। যথাসময়ে অনুষ্ঠান অধীর আগ্রহে দেখতে শুরু করি। উপস্থাপক মোস্তফা জামান আব্বাসী সিলেট সার্কিট হাউসের সবুজ ঘাসের গালিচায় বসে তাঁর সাক্ষাত নেন। তিনি বলেন, পরকালেও গান শুনলে তাঁর আত্মা শান্তি পাবে। দর্শকদের উদ্দেশ্যে স্বরচিত গান পরিবেশন করেন,
‘কোন মেস্তরি নাও বানাইল কেমন দেখা যায়
ঝিলমিল করেরে ময়ূর পঙ্খী নায়…।’
এই প্রথম তাঁর কণ্ঠে গান শুনি। মনে শুনার আরো আগ্রহ জাগে। আমার মনে তিনি নতুন ভাবে আবিস্কৃত হন। ঐ বছর নভেম্বর মাস। বার্ষিক পরীক্ষা সামনে। সন্ধ্যার পরে পড়ায় ব্যস্ত। আব্বার রুমে টিভি চলছে। কয়েকজন বসে আলোচনা করছেন। আমার সেদিকে কোন খেয়াল নেই। আমার বোন ইয়াসমিন এসে বলে পাশের রুমে কে এসেছেন বলতে পারো? আমি একটু বিরক্ত হয়ে বলি কত লোক আসে যায় আমি কি বলব! সে সহজ করে বলে, যিনি এসেছেন তিনি টিভি’তে গান গেয়েছেন। আমি হেসে বলি, শাহ্ আব্দুল করিম । সে বলে, হ্যাঁ। আমি পড়ার টেবিল থেকে গিয়ে দেখি কয়েকজন কথা বলছেন। তিনি আব্বার খাটের উপর বসেছেন। আমাদের ঘরে তাঁকে প্রথম দেখি। আমার দাদী কিছুদিন পূর্বে লন্ডনে মৃত্যু বরণ করেছেন। তিনি পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাতে এসেছেন। মনে মনে খুব ইচ্ছে জাগে তাঁর মুখে সরাসরি গান শুনব। কিন্তু সময় ও সুযোগ অনুকূলে আসেনি।
১৯৯৬ সালের ডিসেম্বর মাস। সিলেট পৌরসভা ধোপাদিঘীর পাড়ে তৎকালীন ওসমানী উদ্যানে তিনদিন ব্যাপী বিজয় মেলার আয়োজন করে। প্রতিদিন সন্ধ্যার পরে বাউল গানের আসর অনুষ্ঠিত হত। দ্বিতীয় দিন শাহ্ আব্দুল করিম তাঁর দল সহ উপস্থিত হন। পৌরসভার চেয়ারম্যান বদর উদ্দিন কামরান বলেন, মঞ্চে উপস্থিত হয়েছেন আমাদের গৌরব বাউল গানের মুকুটহীন সম্রাট শাহ্ আব্দুল করিম ভাই। আমরা তাঁর রচিত কয়েকটি গান শুনব। তিনি স্রোতাদের সালাম জানিয়ে শুরু করেন তাঁর দেহ তত্ত্বমূলক গান
‘গাড়ি চলেনা চলেনা চলেনারে! গাড়ি চলেনা…’। তিনি গানের সাথে সাথে অঙ্গ ভঙ্গিমায় ও স্রোতাদের মুগ্ধ করেন। ডায়নামা বিকল হয়েছে/ হেড লাইট দুইটা জ্বলেনা…’। বলে আঙ্গুল দিয়ে নিজের চোখ যুগল দেখান। এই মঞ্চে তাঁর কয়েকজন শিষ্য ও গান পরিবেশন করেন। তন্মধ্যে প্রয়াত রুহী ঠাকুরের নাম স্মৃতিতে আছে। এই অনুষ্ঠানে প্রথম সরাসরি তাঁর কণ্ঠে স্বরচিত গান শুনি।
১৯৯৭ সালের জুন মাস সিলেটের নবীন প্রবীণ লেখক পাঠকদের জন্য স্মরণীয় মাস। ঐ মাসের ১০-১৪ পাঁচদিন ব্যাপী কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের লেখক পাঠক মুখোমুখি অনুষ্ঠান ছিল। শেষ তিনদিন একজন করে বাংলাদেশর বিখ্যাত লেখকরা উপস্থিত ছিলেন। প্রথম দিন ছিলেন জাফর ইকবাল, দ্বিতীয় দিন ছিলেন হুমায়ূন আহমদ ও তৃতীয় দিন ইমদাদুল হক মিলন। অবশ্যি মিলন অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে পারেন নি। তাঁর মেয়ে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায়। হুমায়ূন আহমেদের লেখক পাঠক মুখোমুখি অনুষ্ঠানে তাঁর পাশে উপস্থিত ছিলেন শাহ্ আব্দুল করিম। আমি কিছুটা বিস্মিত হই! বাংলাদেশের প্রধান লেখক হুমায়ন আহমদের সাথে তাঁর কিসের সম্পর্ক! আমার জানা মতে হুমায়ূন আহমদের নাটকে হাসন রাজার গান আছে। কিন্তু শাহ্ আব্দুল করিমের কোন গান শুনিনি। আমার বিস্ময়ের দরজায় কে যেন করাঘাত করে বলে রতনে রতন চিনে। হুমায়ূন আহমেদের সাথে ফটো তুলে তাঁর সাথে ও ফটো তুলি। আমার এই ফটো তাঁর সাথে জীবনের প্রথম এবং শেষ । মুসলিম সাহিত্য সংসদের মঞ্চ সেই ফটোর ব্যাকগ্রাউন্ড হয়ে আছে।
ঐ বছরের অক্টোবর মাসে আমার বড় চাচা শাহ্ ওয়ারিছ আলী অসুস্থ হয়ে পুরান লেইনস্ত জিন্দাবাজারের তৎকালীন সিটি ক্লিনিকে ছিলেন। একদিন বিকেলে গিয়ে দেখি তাঁকে দেখতে শাহ্ আব্দুল করিম এসেছেন। আমি সালাম করে তাদের কাছে বসি। তিনি চাচার সাথে আলোচনা করছেন। নিরব স্রোতার মত শুনি। চাচা তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, আপনারা গানে ফাতেমা কলছুমার যে কিচ্ছা বলেন তা কতটুকু সত্য? তিনি বলেন, এসব কিচ্ছা যারা গায় তাদের প্রশ্ন করো! আমি কোনদিন বাজে কিচ্ছা লেখিনি ও গাইনি। তাদের আলোচনা কিছুটা বিরতি হলে আমি জিজ্ঞেস করি, হুমায়ূন আহমদের নাটকে কি আপনার গান আছে? তিনি বলেন, নুহাশ চলচ্চিত্রের ব্যানারে আমার লেখা সুর করা পাঁচটি গান বিভিন্ন শিল্পীর কন্ঠে রেকর্ড করা হয়েছে। গানের ভিডিও চিত্র তৈরীর ফাঁেক ফাঁকে আমার সাক্ষাতকার গ্রহণ করে ডকুম্যান্টডারী করেছেন । আমি তাঁকে আবার জিজ্ঞেস করি, আপনাদের গানের কথা (ভাব) বুঝা কঠিন। প্রত্ত্যুতরে তিনি বলেন, আমরা বাংলাদেশের মাটিও মানুষের কথা লেখি। আমাদের লেখা দেশের আপাময় জনসাধারণ বুঝে। তোমাদের কবি নির্মলেন্দু গুণকে বলেছি, সহজ
ভাষায় কবিতা লেখতে। এসব উচ্চাঙ্গ ভাষায় কবিতা বুঝতে হলে দেশের বেটা-বেটি সবাইকে বি,এ পাস করতে হবে।
শাহ্ আব্দুল করিম’র গান প্রথম সাবলিল ভাসায় ১৯৯৬ সালে সেলিম চৌধুরী তার ‘রূপসাগর’ অডিও ক্যাসেট উপস্থাপন করেন। ঐ ক্যাসেটে তাঁর দুইটি গান ছিল;
(১) সখি কুঞ্জ সাজাওগো আজ আমার প্রাণনাথ আসিতে পারে
(২) কেমনে ভূলিব আমি বাঁচিনা তারে ছাড়া আমি ফুল বন্ধু ফুলের ভ্রমরা…।
১৯৯৭ সালে শিল্পী সুবীর নন্দী, বেবী নাজনীন, দিলরুবা খান, সেলিম চৌধুরী ও তুহিনের যৌথ অডিও ক্যাসেট ‘অন্তরে ভালোবাসা’য় ’আমি কুলহারা কলঙ্কিণী….আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম’ গানগুলি বিপুল ভাবে স্রোতাদের কাছে সমাদৃত হয়। এরপর অসংখ্য ক্যাসেটে তাঁর গান ধ্বনি প্রতিধ্বনি তুলেছে। তাঁর গানের মাধ্যমে অনেক গায়ক জনপ্রিয়তা লাভ করেছেন। জনপ্রিয় হয়েছে অনেক নাটক। এখন শাহ্ আব্দুল করিমের গান মানে জনপ্রিয়তার শীর্ষস্থান। তিনি বাউল গান ও বাউল শিল্পীদের মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন। এখন বাউল গান মানে রাত ভর গ্রাম অঞ্চলে বেসুরা সুরে গান গাওয়া নয়। ড্রয়িং রুমের সিডি প্লেয়ার অন করলে এখন বাউল গান বেজে উঠে
‘মায়া লাগাইছে পিরিতি শিখাইছে, না জানি কি করে বন্দে মায়া লাগাইছে….।’ আর এসব সম্ভব হয়েছে তাঁর সহজ সরল যাদুময় ভাষায় মায়াজালে। এখন শিশু যুবক বৃদ্ধ সবাই সেই মায়াজালে বন্ধী হয়ে বলে
‘আইলায় না আইলায় না রে বন্ধু করলায় রে দেওয়ানা….।’
এই জননন্দিত গীতিকার ও শিল্পী ১৯১৬ সালে ১৫ ফেব্র“য়ারী সুনামগঞ্জের দিরাই থানার তাড়ল ইউনিয়নের উজানধল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ইব্রাহীম আলী ও নাইওরজান বিবি তাঁর পিতামাতা। তাঁর দাদার ছোট ভাই ফকির নদিব উল্লার কাছে ’ভাবিয়া দেখ মনে মাটির সারিন্দা বাজায় কোন জনে..!’ গানটি শুনে শুনে গানের প্রতি আকৃষ্ঠ হন। নৈশ বিদ্যালয়ে মাত্র আটদিন বর্ণ শিক্ষা-ই সম্বল। দারিদ্রতার কারণে রাখালের কাজ করতেন। মাঠে ঘাটে হাওরে গরু চরাতেন। তিনি বলেন, ’গরু নিয়ে প্রতিদিন হাওরে যাই, ঈদ শুভদিনেও আমার ছুটি নাই..’। কোন কিছুই তাঁর সঙ্গিত সাধনা দমাতে পারেনি। বাউল ও আধ্যাত্মিক গানের গুরু ছিলেন কামাল উদ্দিন, শাহ্ ইব্রাহিম মস্তান বক্স ও নেত্রকোনার বাউল সাধক রশিদ উদ্দিন। মারফতি, মুর্শিদি, ভাটিয়ালি, মরমি, গণসঙ্গীত, আঞ্চলিক ইত্যাদি গান রচনা করেছেন। দেড় হাজারের বেশি গান লিখেছেন। প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে আফতাব সঙ্গিত (১৯৪৮), গণ সঙ্গিত (১৯৫৭), কালনীর ঢেউ (১৯৮১), ধলমেলা (১৯৯০), ভাটির চিঠি(১৯৯৮), কালনীর কুলে (২০০১) ইত্যাদি। নিজের শেষ সম্বল নয় কেদার জমি বিক্রি করে ১৯৮১ সালে ’কালনীর ঢেউ’ প্রকাশ করেন। তিনি লালন শাহ্, পাঞ্জু শাহ্ ও দুদ্দু শাহের দর্শনে অনুপ্রানিত ছিলেন। ১৯৫৭ সালে ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলনে গণসঙ্গিত পরিবেশন করে মাওলানা ভাসানী, হোসেন সোহরাওয়ার্দী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সান্নিধ্যে আসেন। বঙ্গবন্ধু সুনামগঞ্জের এক জনসভায় তাঁর গানে মুগ্ধ হয়ে ৫০০ টাকা পুরস্কার দিয়েছিলেন।
গত তিন দশক থেকে লোকসঙ্গিতের এক বিশাল অংশ তাঁর দখলে ছিল। একে একে রচনা করেছেন কালজয়ী সঙ্গিত। বাংলা একাডেমি থেকে তাঁর দশটি গান ইংরেজীতে অনুদিত হয়েছে।
২০০০ সালের সেপ্টেম্বরে মুসলিম সাহিত্য সংসদে তাঁর কণ্ঠে সর্বশেষ গান শুনি। ঐদিন রাগীব রাবেয়া সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হন। দর্শকদের অনুরোধে গান পরিবেশন করেন। পিছন থেকে একজন তাঁকে স্মরণ করিয়ে দেন। আর তাঁর দর্শন ও গান শুনার সুযোগ হবেনা। বাউল গান তাঁর হাত ধরে সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত হয়।
২০০১ সালে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান একুশে পদকে ভূষিত হন।
২০০২ সালে প্রকাশিত হয় আইডিয়া স্মারক।
২০০৩ সালে লাভ করেন লেবাক এওর্য়াড।
২০০৪ সালে মেরিল-প্রথম আলো আজীবন সম্মাননা।
২০০৫ সালে সিটিসেল-চ্যানেল আই মিউজিক এওয়ার্ড আজীবন সম্মাননা লাভ করেন।
২০০৬ আর্ন্তজাতিক প্রবীণ দিবসে সালে তাঁকে জাতিসংঘ সম্মাননা প্রদান করা হয়। একই বছর সিলেট সিটি কর্পোরেশন সম্মাননা লাভ করেন।
২০০৮ সালে শিল্পকলা একাডেমী সম্মাননা এবং খান বাহাদুর এহিয়া এস্টেট সম্মাননায় ভূষিত হন।
২০০৯ সালে ২২শে মে সর্বস্তরের সিলেটবাসী তাঁকে সংবর্ধনা জানান। ঐদিন তাঁর রচনা সমগ্র প্রকাশিত হয়। তিনি এভাবে অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেছেন। দেশে-বিদেশে ভক্তদের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন। অবশেষে তিনি সবকিছু ছেড়ে তাঁর দরদীয়া বন্ধুর কাছে চলে যান। যেভাবে তিনি বলেছেন,
দরদীয়া রে বন্ধু দরদীয়া রে,
আমি তোরে চাইরে বন্ধু
আমার আর দরদী নাইরে…।
তিনি অসংখ্য জনপ্রিয় গানের মাধ্যমে যুগ যুগ আমাদের স্মৃতিতে-প্রীতিতে সব সময় বিচরণ করবেন। আমরা তার বিদেহি আত্মার শান্তি কামনা করি!

 

ফয়জুল আলম বেলাল

original post link : http://www.somewhereinblog.net/blog/mustaqim/29074855